সাংবাদিকতার নামে বাড়ছে ‘ভুয়া সাংবাদিক’, বিব্রত পেশাদার সাংবাদিকরা

প্রকাশিত: ১:০৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২৬

সাংবাদিক নাকি ‘নিউজের ভয় দেখানো’ মানুষ?

আজকাল সাংবাদিক হওয়া নাকি খুব সহজ! একটা ফেসবুক পেজ খুললেন, নামের সঙ্গে ‘নিউজ’, ‘মিডিয়া’ বা ‘প্রেস’ লাগিয়ে দিলেন, গলায় একটা কার্ড ঝুলিয়ে নিলেন, হাতে মোবাইল নিলেন, ব্যস! আপনি সাংবাদিক!

অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, সত্যিই অবাক হতে হয়।

আগে সাংবাদিক হতে হলে একটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করতে হতো। সংবাদ সংগ্রহ করতে হতো, তথ্য যাচাই করতে হতো, মানুষের বক্তব্য নিতে হতো, ভুল হলে জবাবদিহি করতে হতো। আর এখন কিছু মানুষের কাছে সাংবাদিকতা মানে হলো, কোথাও গিয়ে ভিডিও করা, ছবি তোলা আর তারপর বলা, ‘আপনার বিরুদ্ধে নিউজ হবে।’

রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল, গেস্ট হাউজ, স্পা সেন্টার, রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এমন আচরণের অভিযোগ কম নয়। প্রথমে পরিচয়, তারপর ছবি বা ভিডিও, এরপর শুরু হয় আসল কথা।

‘ভাই, আপনাদের এখানে কিছু সমস্যা আছে।’

‘বড় নিউজ হয়ে যাবে।’

‘অনেক সাংবাদিক আসবে।’

‘অনলাইনে দিয়ে দেব।’

আর যদি টাকা-পয়সার প্রসঙ্গ আসে, তখন বোঝা যায় আসল উদ্দেশ্যটা কোথায়।

কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘ভাই, ২৬টা অনলাইন আর ফেসবুক পেজে নিউজ হয়ে গেছে।’

শুনলেই মনে হয় বুঝি দেশের সব গণমাধ্যম একসঙ্গে খবরটি প্রকাশ করেছে!

আসলে বাস্তবতা অনেক সময় অন্যরকম। একটি পেজের খবর আরেকটি পেজ কপি করেছে, সেটি আবার আরেকজন কপি করেছে। এভাবে একই খবর ২০-৩০টি জায়গায় চলে গেছে। তারপর সেই সংখ্যা দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভয় দেখানো হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, ২৬টা পেজে নিউজ হলেই কি নিউজ সত্য হয়ে যায়?

একদমই না।

ভুল তথ্যও ১০০টি পেজে ছড়াতে পারে। সত্যতা নির্ভর করে তথ্যের ওপর, পেজের সংখ্যার ওপর নয়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও মানুষের কাছে জবাব দিতে হয়।

একজন সাংবাদিক হয়তো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছেন। কারও বক্তব্য নিতে ফোন করছেন, নথি যাচাই করছেন, ঘটনা সত্য কি না দেখছেন। আর অন্যদিকে কেউ একটা মোবাইল হাতে নিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে গিয়ে বললেন, ‘নিউজ করে দেব।’

তারপর যদি টাকা-পয়সার লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, সাধারণ মানুষ তখন আর আলাদা করে দেখে না কে আসল সাংবাদিক আর কে ভুয়া। সবাইকে একই চোখে দেখতে শুরু করে।

আরেকটা বিষয় খুবই ভয়ংকর।

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সত্যিকারের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই সংবাদ হওয়া উচিত। সাংবাদিকের কাজই হলো অনিয়ম তুলে ধরা। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে যদি কারও কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়, আর টাকা দিলে নিউজ বন্ধ বা পোস্ট সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়, তাহলে সেটা সাংবাদিকতা নয়।

সেটা সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অন্য কিছু করার চেষ্টা।

একজন মানুষ ১৫০০ বা ২০০০ টাকা খরচ করে একটা অনলাইন পোর্টাল খুললেন বলেই তিনি সাংবাদিক হয়ে গেলেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। একটি ওয়েবসাইট থাকা আর সাংবাদিকতা করা এক জিনিস নয়।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।

কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। ফেসবুক পেজ থাকলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। ইউটিউব চ্যানেল থাকলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে কাউকে ভয় দেখানো তো কোনোভাবেই সাংবাদিকতা হতে পারে না।

তাই এখন সময় এসেছে সাধারণ মানুষকেও একটু সচেতন হওয়ার।

কেউ সাংবাদিক পরিচয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানে গেলে তার পরিচয় যাচাই করুন। কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন, সেটি জিজ্ঞেস করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন।

আর যারা সত্যিই সাংবাদিকতা করেন, তাদেরও উচিত নিজেদের পেশাটাকে সম্মানের জায়গায় রাখা।

কারণ কয়েকজন মানুষের অপকর্মের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হোক, এটা কোনো প্রকৃত সাংবাদিকই চাইবেন না।

সাংবাদিকতা কোনো ভয় দেখানোর ব্যবসা নয়।

সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলার জায়গা।

আর সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে সাংবাদিক হিসেবে নয়, বরং তার কর্মকাণ্ডের জন্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।